মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

শহীদ বুদ্ধিজীবী

বুদ্ধিজীবী হত্যাঃ ইতিহাসের বর্বরতম পৈশাচিকতা

          বিজয়ের আনন্দে যখন বাংলার আকাশ-বাতাস মুখরিত, তখন এই আনন্দে একটা বিষাদের ছায়া সকলের মন ভারাক্রামত্ম করে তোলে। এই বিজয়ের পশ্চাতে যিনি মূলনায়ক, যিনি গত তেইশ বছর পাকিসত্মানী জুলুম-নির্যাতনের বিরম্নদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম করে এসেছেন আর লাঞ্ছনা ভোগ করেছেন, সেই বঙ্গবন্ধু আজ জনগনের আনন্দে অংশ নিতে পারছেন না। তিনি পাকিসত্মানী কারাগারে বন্দী জীবন যাপন করছেন। কিন্তু এই দুঃখ ভারাক্রামত্ম বিষাদিত মনকে অন্য যে খবর একেবারে সস্নান ও সত্মব্ধ করে দিল তা আরো করম্নন, ভয়াবহ, বাংলার মানুষ সে খবর শুনে শিউরে উঠলো, আর্তনাদ করে উঠলো বিজয় উলস্নাসে মত্ত বাংলার মানুষ। শোকে মূহ্যমান হল সংগ্রামী জনতা, যখন শুনলো, তাদের দেশের শ্রেষ্ঠ সমত্মানদের বিজয়ের মাত্র ১দিন আগে (১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১) আল বদররা ধরে নিয়ে গিয়ে কুচি-কুচি করে হত্যা করেছে। ইতিহাসের পৈশাচিক এ হত্যাকান্ড বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড নামে খ্যাত।

বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞাঃ

প্রচলিত ধারনা অনুযায়ী যারা দৈহিক শ্রমের বদলে মানসিক শ্রম বা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম দেন তারাই বুদ্ধিজীবী। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্রন্থে বুদ্ধিজীবীদের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা হলো : বুদ্ধিজীবী অর্থ লেখক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, কন্ঠশিল্পী, সকল পর্যায়ের শিÿক, গবেষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, চলচ্চিত্র ও নাটকের সাথে সংশিস্নষ্ট ব্যক্তি, সমাজসেবী ও সংস্কৃতিসেবী।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের কারণঃ

পাকিসত্মান নামক অগণতান্ত্রিক এবং অবৈজ্ঞানিক রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই বাঙ্গালিদের সাথে পশ্চিম পাকিসত্মানের রাষ্ট্রযন্ত্র বৈষম্যমূলক আচরণ করতে থাকে। তারা বাঙ্গালিদের ভাষা ও সংস্কৃতির উপর আঘাত হানে। এরই ফলশ্রম্নতিতে বাঙ্গালির মনে ÿÿাভ পুঞ্জিভূত হতে থাকে এবং বাঙ্গালিরা এই অবিচারের বিরম্নদ্ধে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরম্ন করে। এ সকল আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকতেন সমাজের সর্বসত্মরের বুদ্ধিজীবীরা। তারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বাঙ্গালিদের বাঙ্গালি জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফলেই জনগণ ধীরে ধীরে নিজেদের দাবি ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে থাকে যা পরবর্তীতে তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে। এজন্য শুরম্ন থেকেই বুদ্ধিজীবীরা পাকিসত্মানের সামরিক শাসকদের লÿ্যবস্ত্ততে পরিণত হয়েছিলেন। তাই যুদ্ধের শুরম্ন থেকেই পাকিসত্মানি বাহিনী বাছাই করে করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। এছাড়া যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিসত্মানের পরাজয় যখন শুধু সময়ের ব্যাপার তখন বাঙ্গালি জাতি যেন, শিÿা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে তাই তারা বাঙ্গালি জাতিকে মেধাশূন্য করে দেবার লÿÿ্য তালিকা তৈরি করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। এ প্রসঙ্গে শহীদ বুদ্ধিজীবীকোষ গ্রন্থে যে যুক্তিটি দেয়া হয়েছে তা প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিযুক্ত:-

          এটা অবধারিত হয়, বুদ্ধিজীবীরাই জাগিয়ে রাখেন জাতির বিবেক, জাগিয়ে রাখেন তাদের রচনাবলীর মাধ্যমে, সাংবাদিকদের কলমের মাধ্যমে, গানের সুরে, শিÿালয়ে পাঠদানে, চিকিৎসা, প্রকৌশল, রাজনীতি ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের সান্নিধ্যে এসে। একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার প্রথম উপায় বুদ্ধিজীবী শূন্য করে দেয়া। ২৫ মার্চ রাতে এই প্রক্রিয়া শুরম্ন হয়েছিল অতর্কিতে, তারপর ধীরে ধীরে, শেষে পরাজয় অনিবার্য জেনে ডিসেম্বর ১০ তারিখ হতে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে দ্রম্নতগতিতে।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের পরিকল্পনাঃ

২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার সাথে একসাথেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পাকিসত্মানি সেনারা অপারেশন চলাকালীন খুঁজে খুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অনেক শিÿককে ২৫ মার্চের রাতেই হত্যা করা হয়। তবে, পরিকল্পিত হত্যার ব্যাপক অংশটি ঘটে যুদ্ধ শেষ হবার মাত্র কয়েকদিন আগে। যুদ্ধ চলাকালীন পাকিসত্মানি সেনাবাহিনী এবং তাদের প্রশিÿÿত আধা-সামরিক বাহিনী আল-বদর এবং আল-শামস একটি তালিকা তৈরি করে, যেখানে এই সব স্বাধীনতাকামী বুদ্ধিজীবীদের নাম অমত্মর্ভূক্ত করা হয়। পাকিসত্মানি বাহিনীর পÿÿ এ কাজের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর জেনারেল রাওফরমান আলী। কারণ স্বাধীনতার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত বঙ্গভবন থেকে তার স্বহসেত্ম লিখিত ডায়েরী পাওয়া যায় যাতে অনেক নিহত ও জীবিত বুদ্ধিজীবীর নাম পাওয়া যায়। এছাড়া আইয়ুব শাসন আমলের তথ্য সচিব আলতাফ গওহরের এক সাÿাৎকার হতে জানা যায় যে, ফরমান আলীর তালিকায় তার বন্ধু কবি সানাউল হকের নাম ছিল। আলতাফ গওহরের অনুরোধে রাওফরমান আলী তার ডায়েরীর লিস্ট থেকে সানাউল হকের নাম কেটে দেন। এছাড়া আলবদরদের জন্য গাড়ীর ব্যবস্থা তিনিই করেছিলেন বলে তার ডায়েরীতে একটি নোট পাওয়া যায়।

          এছাড়া তার ডায়েরীতে হেইট ও ডুসপিক নামে দুজন আমেরিকান নাগরিকের কথা পাওয়া যায়। এদের নামের পাশে ইউএসএ এবং ডিজিআইএস লেখা ছিল। এর মধ্যে হেইট ১৯৫৩ সাল থেকে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীতে যুক্ত ছিল এবং ডুসপিক ছিল সিআইএ এজেন্ট। এ কারণে সন্দেহ করা হয়ে থাকে, পুরো ঘটনার পরিকল্পনায় সিআইএ’র ভূমিকা ছিলো। এ দুজন ইন্দোনেশিয়ায় গণহত্যায় জড়িত ছিলো।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের বিবরণঃ

ডিসেম্বরের ৪ তারিখ হতে ঢাকায় নতুন করে কারফিউ জারি করা হয়। ডিাসেম্বরের ১০ তারিখ হতে বুদ্ধিজীবী হত্যাকন্ডের প্রস্ত্ততি নেয়া হতে থাকে। মূলত ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনার মূল অংশ বাসত্মবায়ন হয়। অধ্যাপক, সাংবাদিক, শিল্পী, প্রকৌশলী, লেখকসহ চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীদের পাকিসত্মান সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসরেরা জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যায়। সেদিন প্রায় ২০০ জনের মত বুদ্ধিজীবীদের তাদের বাসা হতে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। হত্যাকারীরা চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীদের তাঁদের নিজ নিজ বাড়ি থেকে গেস্টাপো কায়দায় তুলে নিয়ে কালো কাপড়ে চোখ বেঁধে কোনো বিশেষ নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যেত। এসব নির্যাতন কেন্দ্র ছিল মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া , রাজারবাগ, ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার  (মোহম্মদপুর) এবং শহরের অন্যাণ্য এলাকায়। বেশিরভাগ সময় তারা শহরে জারীকৃত কার্ফুর সুযোগে বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যেত। তাঁদের উপর চলত নির্মম দৈহিক নির্যাতন। তারপর বেশিরভাগ ÿÿত্রে বেয়নেটের আঘাতে তাঁদের দেহ ÿতিবিÿত করে হত্যা করা হতো। ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান বধ্যভূমি ছিল আলেকদি, কালাপানি, রাইনখোলা, মিরপুর বাংলা কলেজের পশ্চাতভাগ, হরিরামপুর গোরসত্মান, মিরপুরের শিয়ালবাড়ি, মোহাম্মদপুর থানার পূর্বপ্রামত্ম ও রায়ের বাজার। রায়ের বাজার ও মিরপুরের জলাভূমিতে ডোবানালা, নিচু জমি ও ইটের পাঁজার মধ্যে বুদ্ধিজীবীদের বহুসংখ্যক মৃতদেহ বিÿÿপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। কালো কাপড়ে চোখ বাঁধা এবং পেছনে হাত বাঁধা অবস্থায় ÿতবিÿত এই লাশগুলোর অধিকাংশেরই দেহ ফুলে উঠেছিল। তাঁদের বুকে মাথায় ও পিঠে ছিল বুলেটের আঘাত এবং সারাদেহে বেয়নেটের ÿতচিহ্ন। এমনকি, আত্মসমর্পণ ও যুদ্ধের আনুষ্ঠনিক সমাপ্তির পরেও পাকিসত্মানি সেনাবাহিনী এবং তার সহযোগীদের গোলাগুলির অভিযোগ পাওয়া যায়। এমনই একটি ঘটনায়, ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের ৩০ তারিখ স্বনামধন্য চলচ্চিত্র-নির্মাতা জহির রায়হান প্রাণ হারান। এর পেছনে সশস্ত্র বিহারীদের হাত রয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়।

এদেশীয় দোসরদের ভূমিকা ঃ

          পাকিসত্মানী সামরিক জামত্মার পÿÿ এ হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। আর তাকে তালিকা প্রসত্মতিতে সহযোগীতা ও হত্যাকান্ড বাসত্মবায়নের পেছেনে ছিল মূলত জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক গঠিত কুখ্যাত আল বদর বাহিনী। বুদ্ধিজীবী  হত্যার প্রধান ঘাতক ছিলেন বদর বাহিনীর চৌধুরী মঈনুদ্দীন (অপারেশন ইন-চার্জ) ও আশরাফুজ্জামান খান (প্রধান জলস্নাদ)। ১৬ ডিসেম্বরের পর আশরাফুজ্জামান খানের নাখালপাড়ার বাড়ি থেকে তার একটি ব্যক্তিগত ডায়েরী উদ্ধার করা হয়, যার দুটি পৃষ্ঠায় প্রায় ২০ জন বুদ্ধিজীবরি নাম ও বিশ^বিদ্যালয়ের তাদের কোয়ার্টার নম্বরসহ লেখা ছিল। তার গাড়ির ড্রাইভার মফিজুদ্দিনের দেওয়া সাÿ্য অনুযায়ী রায়ের বাজারের বিল ও মিরপুরের শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি হতে বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর গলিত লাশ পাওয়া যায় যাদের সে নিজ হাতে গুলি করে মেরেছিল। আর চৌধুরী মঈনুদ্দীন ৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি অবজারভার ভবন হতে বুদ্ধিজীবীদের নাম ঠিকানা রাও ফরমান আলী ও ব্রিগোডিয়ার বশীর আহমেদকে পৌঁছে দিতেন। এ ছাড়া আরো ছিলেন এ বি এম খালেক মজুমদার (শহীদুলস্নাহ কায়সারের হত্যাকারী), মাওলানা আবদুল মান্নান (ডাঃ আলীম চৌধুরীর হত্যাকারী), কসাই কাদের (কবি মেহেরম্নন্নেসার হত্যাকারী) প্রমুখ। চট্টগ্রামে প্রধান হত্যাকারী ছিলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী ও তার দুই ছেলে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং গিয়াস কাদের চৌধুরী।

 

          বুদ্ধিজীবীর হত্যার প্রধান ভূমিকা পালন আল বদর বাহিনী। সমগ্র পাকিসত্মানের আল বদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামি। ৭ নভেম্বর ইসলামী ছাত্রসংঘ ঘটা করে সারাদেশে যে আল বদর দিবস পালন করে, প্রকৃত পÿÿ সেদিন থেকেই শুরম্ন হয় বুদ্ধিজীবী হত্যার আয়োজন। আল বদররা ‘শয়তান নির্মূল অভিযান’ -এর নামে এ সময় বুদ্ধিজীবীদের কাছে ‘শনি’ নামে চিঠি পাঠায়। চিঠিতে এরা বুদ্ধিজীবীদের হুমকি দিয়ে লেখে:

 

                তোমার মনোভাব, চালচলন ও কাজকর্ম কোনটাই আমাদের অজানা নেই। ....এই চিঠি পাওয়ার সাথে সাথে নির্মূল হওয়ার জন্য প্রস্ত্তত হও। -শনি।

 

          আলবদর ও আলশামস গঠিত হয় প্রধানত জামায়াতে ইসলামি ও ছাত্রসংঘের কর্মী ও সমর্থকদের দ্বারা। সারা বছর যাবত তারা হত্যাকান্ড চালালেও পরাজয় আসন্ন জেনে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহতেই তারা মরণ কামড় দেয়। এ সম্পর্কে সে-সময়কার দৈনিক বাংলায় ১৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়েছিল একটি প্রতিবেদন-

          ‘‘এই নৃশংস হত্যাকান্ড চালিয়েছে গত সপ্তাহ ধরে জামায়াতে ইসলামীর আলবদর। শহরের কয়েকশ বুদ্ধিজীবী ও           যুবককে ধরে নিয়ে গিয়ে অমানুষিকভাবে হত্যা করেছে। গতকাল রায়েরবাজার ও ধানমন্ডি এলাকায় বিভিন্ন গর্ত হতে    বহু সংখ্যক লাশ উদ্ধার করা হয়। এদের মধ্যে অধ্যাপক, ডাক্তার, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের লাশও রয়েছে। এ   পর্যমত্ম কতিপয় ব্যক্তির লাশ সনাক্ত করা গেছে। অনেক লাশই বিকৃত হয়ে গেছে, চেনার উপায় নেই। গত এক সপ্তাহে যতজন নিখোঁজ হয়েছেন অনুমান করা হচ্ছে যে, এদের একজনকেও আলবদর রেহাই দেয়নি। ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক    দল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংস্থা ইসলামী ছাত্রসংঘের সশস্ত্র গ্রম্নপ আলবদর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা নগরী মুক্ত   হওয়ার পূর্ব পর্যমত্ম এক সপ্তাহে শহরের কয়েকশত বুদ্ধিজীবী ও যুবকদের ধরে নিয়ে যায়।’’

হিংস্রতার বিবরন ঃ

১৬ ডিসেম্বর দেশ মুক্ত হলে অলবদরদের দ্বারা অপহৃতদের লাশ খুঁজতে বের হন আত্মীয় স্বজনরা। প্রধানত রায়ের বাজার এবং মিরপুরের সেলে অগণিত লাশ, কংকাল। লেখিকা হামিদা রহমান ১৬ ডিসেম্বর রায়ের বাজার ঘুরে এসে লিখেছিলেন-

          ‘‘আর একটু এগিয়ে যেতেই সামনে বড় বড় দুটো মসত্ম মানুষ, নাক কাটা, কান কাটা, মুখের কাছ থেকে কে যেন খামচিয়ে মাংস তুলে নিয়েছে হাত-পা বাঁধা।...

           ‘‘আর একটু এগিয়ে যেতেই বাঁ হাতের যে মাটির টিবিটা ছিল তারই পাদদেশে একটি মেয়ের লাশ। মেয়েটির চোখ বাঁধা। মুখ ও নাকের কোনো আকৃতিই নেই কে যেন অস্ত্র দিয়ে তা কেটে খামচিয়ে তুলে নিয়েছে। সত্মনের একটি অংশ কাটা... মেয়েটি সেলিনা হোসেন পারভীন। শিলালিপির এডিটর।...

          ‘‘মাঠের পর মাঠ চলে গিয়েছে। প্রতিটি ফলার পাশে হাজার মাটির ঢিবির মধ্যস্থ কঙ্কাল সাÿ্য দিচ্ছে কত লোককে যে এই মাঠে হত্যা করা হয়েছে।’’

লন্ডনের দি টাইমস পত্রিকার পিটার হেজেলহার্স্ট, ৩০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ লিখেছেন,

          ‘‘... ... একথা কেউ কোনোদিন বলতে পারবে না যে, মুক্তিযুদ্ধে কতজন বুদ্বিজীবী, সাংবাদিক, ডাক্তার প্রমূখকে হত্যা করা হয়েছে। এদের অধিকাংশই কোনো দিনই রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। তবুও এদের আর কোনো খোঁজ খবর পাওয়া যায়নি। এঁরা চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে। ...ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আনোয়ার পাশার স্ত্রী মোহসিনাকে রাজধানীর উপকন্ঠে একটা বিরাট গর্তের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াতে দেখলাম। এখানে অসংখ্য বাঙ্গালি বুদ্ধিজীবীর গলিত ও দুর্গন্ধময় লাশ পড়ে আছে। মোহসিনা এই গলিত লাশগুলো মধ্যে তাঁর স্বামীর লাশটা শনাক্ত করার বৃথা চেষ্টা করছে।...’’

বধ্যভূমি আবিস্কৃত হওয়ার পরপর প্রকাশিত দৈনিক পূর্বদেশের রিপোর্ট পড়ে পাঠক শিহরিত হবে ইতিহাসের সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের নিষ্ঠুরতা ও পৈশাচিকতার বিবরণ জেনে, জামায়াতে ইসলাম ও তার সহযোগী ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্র শিবিরের পূর্বতন নাম) ধর্মের নামে এ অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছিল:

          যদি না যেতাম সেই শিয়ালবড়িতে তাহলে দেখা হতো না ইতিহাসের বর্বরতম অধ্যায়কে। অনুসন্ধিৎসু হিসেবে যা দেখাও কোন মানুষের উচিত নয়।...

কাটাসুরের হত্যাকান্ডকে মোটামুটি একটা থিওরিতে ফেলা যায়। একে যে কোন হিসেবে কোন থিওরিতে ফেলা যায় না।.... ক’ হাজার, লোককে সেখানে হত্যা করা হয়েছে? যদি বলি দশ হাজার, যদি বলি বিশ হাজার, কি পঁচিশ হাজার তাহেল কি কেউ অস্বীকার করতে পারবেন?... আমরা শিয়ালবাড়ির যে বিসত্মীর্ণ বনবাদাড়পূর্ণ এলাকা ঘুরেছি তার সর্বত্রই দেখেছি শুধু নরকঙ্কাল আর নরকঙ্কাল।... দেখেছি কুয়ার মধ্যে মানুষের হাড়।... ইতিহাসে পৈশাচিক ভাবে হত্যা করার অনেক কাহিনী পড়েছি। কিন্তু শিয়ালবাড়িতে ঐ পিশাচরা যা করেছে এমন নির্মমতার কথা কি কেউ পড়েছেন! শুনেছেন বা দেখেছেন? কসাইখানায় কসাইকে দেখেছি জীবজন্তুর গোশতকে কিমা করে দিতে। আর শিয়ালবাড়িতে গিয়ে দেখলাম কিমা করা হয়েছে হাড়। একটা মানুষকে দু’টুকরো করলেই যথেষ্ট পাশবিকতা হয়। কিন্তু তাকে কিমা করার মধ্যে কোন পাশবিক উলস্নাস?’’

 

বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিসংখ্যান ও তালিকাঃ

বাংলাপিডিয়া হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা নিমণরূপঃ-

শিÿাবিদ- ৯৯১ জন

সাংবাদিক - ১৩ জন

চিকিৎসক - ৪৯ জন

আইনজীবী - ৪২ জন

অন্যান্য (সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী এবং প্রকৌশলী) - ১৬ জন

২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যমত্ম বেশ কয়েকজন স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী পাকবাহিনীর হাতে প্রাণ হারান। তাদের মধ্যে উলেস্নখযোগ্য:-

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিÿকঃ

          ডঃ গোবিন্দ চন্দ্র দেব (দর্শনশাস্ত্র)।

          ডঃ মুনির চৌধুরী (বাংলা সাহিত্য)।

          ডঃ মোফাজ্জেল হায়দার চৌধুরী (বাংলা সাহিত্য)।

          ডঃ আনোয়ার পাশা (বাংলা সাহিত্য)।

          ডঃ আবুল খায়ের (ইতিহাস)।

          ডঃ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা (ইংরেজি সাহিত্য)।

          ডঃ সিরাজুল হক খান (শিÿা)।

          ডঃ এ এন এম ফাইজুল মাহী (শিÿা)।

          হুমায়ন কবীর (ইংরেজী সাহিত্য)।

          রাশিদুল হাসান (পদার্থবিদ্যা)।

          ফজলুর রহমান খান (মৃত্তিকা বিজ্ঞান)।

          এন এম মনিরম্নজ্জামান (পরিসংখ্যান)।

          এ মুকতাদির (ভূ-বিদ্যা)।

          শরাফত আলী (গণিত)।

          এ আর কে খাদেম (পদার্থবিদ্যা)।

          অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য (ফলিত পদার্থবিদ্যা)।

          এম এ সাদেক (শিÿা)।

          এম সাদত আলী (শিÿা)।

          সমেত্মাষচন্দ্র ভট্টাচার্য (ইতিহাস)

          রাশীদুল হাসান (ইংরেজি)

রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিÿকঃ

          ডঃ হবিবুর রহমান (গণিত বিভাগ)।

          ডঃ শ্রী সুখরঞ্জন সমাদ্দার (সংস্কৃত)।

          মীর আবদুল কাইউম (মনোবিজ্ঞান)।

চিকিৎসকঃ

          অধ্যাপক ডাঃ মোহাম্মদ ফজলে রাবিব (হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ)।

          অধ্যাপক ডাঃ আলিম চৌধুরী (চÿু বিশেষজ্ঞ)।

          অধ্যাপক ডাঃ শামসুদ্দীন আহমেদ।

          অধ্যাপক ডাঃ আব্দুল আলিম চৌধুরী।

          ডাঃ হুমায়ুন কবীর।

          ডাঃ আজহারম্নল হক।

          ডাঃ সোলায়মান খান।

          ডাঃ আয়েশা বদেরা চৌধুরী।

          ডাঃ কসির উদ্দিন তালুকদার।

          ডাঃ মনসুর আলী।

          ডাঃ মোহাম্মদ মোর্তজা।

          ডাঃ মফিজউদ্দীন খান।

          ডাঃ জাহাঙ্গীর।

          ডাঃ নুরম্নল ইমাম।

          ডাঃ এস কে লালা।

          ডাঃ হেমচন্দ্র বসাক।

          ডাঃ ওবায়দুল হক।

          ডাঃ আসাদুল হক।

          ডাঃ মোসাবেবর আহমেদ।

          ডাঃ আজহারম্নল হক (সহকারী সার্জন)।

          ডাঃ মোহাম্মদ শফী (দমত্ম চিকিৎসক)।

অন্যান্য

          শহীদুলস্নাহ কায়সার (সাংবাদিক)।

          নিজামুদ্দীন আহমেদ (সাংবাদিক)।

          সেলিনা পারভীন (সাংবাদিক)।

          সিরাজউদ্দীন হোসেন (সাংবাদিক)।

          আলতাফ মাহমুদ (গীতিকার ও সুরকার)।

          আ ন ম গোলাম মুসত্মফা (সাংবাদিক)।

          ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (রাজনীতিবিদ)।

          রণদাপ্রসাদ সাহা (সমাজসেবক এবং দানবীর)।

          যোগেশ চন্দ্র ঘোষ (শিÿাবিদ, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক)।

          জহির রায়হান (লেখক, চলচ্চিত্রকার)।

          মেহেরম্নন্নেসা (কবি)

          ডঃ আবুল কালাম আজাদ (শিÿাবিদ, গণিতজ্ঞ)।

          নাজমূল হক সরকার (আইনজীবী)।

          নূতন চন্দ্র সিংহ (সমাজসেবক, আয়ূর্বেদিক চিকিৎসক)।

 

          ইতিহাসের এই বর্বোরোচিত হত্যাকান্ডের কুলাঙ্গারদের প্রতি ঘৃণা জানায় কোটি কোটি দেশপ্রেমিক বাঙ্গালি। স্বাধীনতার কবি প্রয়াত শামসুর রাহমান তাঁর কবিতায় এভাবেই জাতির সূর্যসমত্মানদের হত্যাকারী দেশদ্রোহী রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের শাসিত্ম কামনা করেছেন।‘‘আজ এই ঘোর রক্ত গোধূলীতে দাঁাড়িয়ে/আমি অভিশাপ দিচ্ছি তাদের/যারা আমার কলিজায় সেঁটে দিয়েছে/একখান ভয়ানক কৃষ্ণপÿ/’... কিংবা ‘একঝাঁক ঝাঁ ঝাঁ বুলেট তাদের বÿ বিদীর্ণ করম্নক/এমন সহজ শাসিত্ম আমি কামনা করি না তাদের জন্য’...। ‘‘তাই আমিও কবির উচ্চারনের সাথে দীপ্তকন্ঠে শপথ নিয়ে শেষ করবো। আজ সেই চৌদ্দই ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। দেশের মেধাবী ও শ্রেষ্ঠ সমত্মান বুদ্ধিজীবীদের নিধনের স্মৃতিঘেরা শোকাবহ দিন। ইতিহাসের পাতায় কালো অÿরে উৎকীর্ণ বেদনা বিধুর কালবেলা। স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরে হলেও কতিপয় নরপিশাচের বিচার হয়েছে বাকিদের বিচারের অপেÿায় গোটা জাতি। শহীদদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যা এবং স্বজনেরা ও আশায় বুক বেঁধেছে, ঘৃণ্য নরপশু বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে জাতি কলঙ্কের হাত থেকে মুক্তি পাবে।

ছবি


সংযুক্তি


সংযুক্তি (একাধিক)



Share with :
Facebook Twitter